কোন জাতের কবুতর বেশি বাচ্চা দেয় ২০২৬
কবুতর পালন বর্তমানে বাংলাদেশে একটি জনপ্রিয় ও লাভজনক খামারভিত্তিক উদ্যোগ। অল্প জায়গা, কম খরচ এবং দ্রুত বংশবিস্তার করার ক্ষমতার কারণে অনেকেই কবুতর পালন করে নিয়মিত আয় করছেন।
তবে নতুন খামারিরা সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি করেন তা হলো কোন জাতের কবুতর বেশি বাচ্চা দেয়? এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিতভাবে সেই প্রশ্নের উত্তর দেব এবং বাচ্চা উৎপাদনে সেরা কবুতরের জাতগুলো সম্পর্কে আলোচনা করব।
.
কবুতর বছরে কতবার বাচ্চা দেয়?
সাধারণত একটি সুস্থ কবুতর জোড়া বছরে গড়ে ৮–১২ বার ডিম দেয়। প্রতিবারে সাধারণত ২টি করে বাচ্চা হয়। তবে জাতভেদে, খাবার, পরিবেশ ও যত্নের ওপর নির্ভর করে এই সংখ্যা কম বা বেশি হতে পারে।
কোন জাতের কবুতর বেশি বাচ্চা দেয়? (সেরা জাতসমূহ)
পৃথিবীতে প্রায় অনেক ধরণের জাতের কবুতর রয়েছে। এর মধ্যে কিছু জাত রয়েছে যেগুলো জাতের কবুতর প্রচুর পরিমাণে বাচ্চা প্রদান করতে সক্ষম। তাই এই সকল জাত পালন করে অনেক লাভবান হওয়া যায়। তাই সকল খামারীদের এই সকল জাতের কবুতর অনেক পছন্দের।
কিং কবুতর (King Pigeon)
কিং কবুতর বাচ্চা উৎপাদনের দিক থেকে সবচেয়ে জনপ্রিয় জাতগুলোর একটি।
বিশেষ বৈশিষ্ট্য:
- বছরে প্রায় ১০–১২ বার বাচ্চা দেয়
- বাচ্চার ওজন বেশি হয়
- বাজারে চাহিদা ও দাম ভালো
যারা বাণিজ্যিকভাবে কবুতর পালন করতে চান, তাদের জন্য কিং কবুতর খুবই লাভজনক।
হোমার কবুতর (Homer Pigeon)
হোমার কবুতর মূলত বার্তা বহনের জন্য পরিচিত হলেও বাচ্চা উৎপাদনেও বেশ ভালো।
বিশেষ বৈশিষ্ট্য:
- বছরে ৮–১০ বার বাচ্চা দেয়
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো
- পালন সহজ
নতুন খামারিদের জন্য হোমার কবুতর একটি নিরাপদ পছন্দ।
সিরাজি কবুতর (Siraji Pigeon)
বাংলাদেশে সবচেয়ে পরিচিত দেশি জাতের কবুতর হলো সিরাজি।
বিশেষ বৈশিষ্ট্য:
- বছরে ৮–১০ বার বাচ্চা দেয়
- দেশি পরিবেশে সহজে মানিয়ে নেয়
- খাবার খরচ কম
কম খরচে বেশি লাভের জন্য সিরাজি কবুতর আদর্শ।
গিরিবাজঃ এই গিরিবাজ জাতের কবুতর হলো একটি উন্নত প্রজাতির একটি জাত। গবেষণায় পাওয়া যায়, এক জোড়া গিরিবাজ কবুতর প্রতিমাসে একজোড়া ডিম ও একজোড়া বাচ্চা দিতে সক্ষম।
এই কবুতরের অন্যসকল কবুতরের থেকে বেশি পরিমাণে এনার্জি থাকে। যার জন্য এরা প্রচুর পরিমাণে উড়তেও পারে।
জালালী কবুতরঃ এই জালালী কবুতরও বেশি পরিমাণে ডিম ও বাচ্চা দিতে পারে। আর এই কবুতর খব কম ডিম নষ্ট করে। আর এর সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এই কবুতরের বাচ্চা উঠার পরে যদি বাচ্চার বয়স ১৫ দিন হয় তাহলেই এই কবুতর আবার ডিম দিতে পারে। অর্থাৎ ১৫ দিন পর পরই এই কবুতর ডিম দিতে সক্ষম।
তাহলে আমরা এখন বুঝতে পারলাম অন্যসকল কবুতরের থেকে গিরিবাজ এবং জালালী কবুতর ভালো। আর এই দুই কবুতরের মধ্য থেকে আবার যদি বিচার বিশ্লেসন করা হয় তাহলে জালালী কবুতর অনেক ভালো। তার কারণ হলো এই কবুতর ১৫ দিন পরপরই ডিম বাচ্চা দিতে সক্ষম। ফলে লাভজনকও খুব সহজেই হওয়া যাবে।
কবুতরের ডিম পাড়ার লক্ষণ
সাধারণত কবুতরের পাখা ঝরে গেলে নর ও মাদি কবুতর একসাথে রাখলে সাধারণভাবে ১৮ থেকে ২০ দিন এর মধ্যে ডিম দিয়ে দেয়।
অবশ্যই পড়ুনঃ বয়লার মুরগির ডিমের ক্ষতিকর দিক
তবে কবুতরটি যদি শুধুমাত্র সুস্থ সবল থাকে তবে ডিম দিয়ে থাকে তাড়াতাড়ি। আরেকটি লক্ষণ হল মাদি কবুতর দিয়ে ডিম পাড়ার আগে নির্দিষ্ট স্থানে অর্থাৎ ডিম পাড়ার জন্য ডিমের হাঁড়িতে বসে থাকে।
অবশ্যই পড়ুনঃ ডিম পাড়া মুরগির খাবার তালিকা
আমরা জানি যে কবুতর সব সময় বিকাল বা সন্ধ্যায় ডিম দিতে পছন্দ করে। তবে ডিম দেওয়ার আগে দেখবেন ডিম বের হওয়ার স্থানটি সব সময় খোলা থাকে এবং মাদি কবুতরটির লেজ গুটিয়ে থাকে। চলুন আরো ভালোভাবে জেনে নিই কবুতরের ডিম পাড়ার লক্ষনগুলোঃ
- ডিম পাড়ার আগে মাদি কবুতরটি ডিম পাড়ার নির্দিষ্ট স্থানে থাকবে।
- ডিম পাড়ার জন্য ডিমের হাড়িতে বসে থাকবে।
- কবুতর সাধারণত সন্ধ্যায় বা বিকালে ডিম দিয়ে থাকে।
- নর কবুতর সব সময় মাদী কবুতরের পিছে লেগে থাকে।
- নর কবুতর মাদি কবুতরকে টুকাতে থাকে এবং খেতে দিতে চায় না।
- ছেলে কবুতরটি মাদি কবুতরকে ডিম পাড়ার জন্য আগ্রহ যোগায় দেখতে পাবেন সব সময় বিরক্ত করে।
- ছেলে কবুতর মাদি কবুতরকে বিরক্ত করে থাকে ডিম দেয়ার জন্য।
- মাদী কবুতর লেজ গুটিয়ে থাকবে ডিম পাড়ার আগে।
ভাল জাতের কবুতর চিনবেন যেভাবে
আপনি যদি একজন নতুন খামারি হয়ে থাকেন তাহলে অবশ্যই আপনাকে ভালো জাতের কবুতর ভালোভাবে চিনতে হবে। আর আপনি যদি বাজার থেকে ভালো জাতের কবুতর চিনা না ক্রয় করতে পারেন তাহলে আপনি আপনার আশানুরুপ ফল পাবেন না। যেমন আপনার কবুতর ডিম কম দিতে পারে। অথবা বাচ্চা কম ফুটাতে পারে ইত্যাদি।
তাই আপনাকে সেইভাবে ফলন পেতে হলে অবশ্যই আপনাকে ভালো জাতের কবুতর দেখে চিনতে হবে। আপনি কিভাবে বুঝবেন এই কবুতরটি ভালো। সেই সম্পর্কে চলুন এখন তাহলে জেনে নেওয়া যাক।
- একটি ভালো সুস্থ কবুতরের শরীরের পালক উজ্জ্বল থাকবে।
- চোখ অনেক বেশি পরিষ্কার ও উজ্জ্বল থাকবে।
- ভালো জাতের কবুতরের নাকের জায়গা অনেক পরিষ্কার ও শুকনো থাকবে। তাই দেখে শুনে ক্রয় করা উচিত।
- কবুতরের ঠোট ঠিক আছে কিনা সেটা দেখতে হবে।
- কবুতর কিনার সময় এর পায়ের দিকে একটু লক্ষ্য রাখবেন। অর্থাৎ কবুতরটি ঠিক করে হাটতে পারে কিনা সেটা একটু দেখে নিবেন।
- কবুতরের শ্বাস নেওয়ার ধরণ টা একটু দেখে নিবেন। অর্থাৎ যেই কবুতর বেশি শ্বাস নিবে সেই কবুতর ক্রয় করা থেকে বিরত থাকুন।
- একটি সুস্থ কবুতরের সবথেকে ভালো দিক হলো সেই কবুতর সব সময় ব্যাস্ত থাকবে। আর অসুস্থ কবুতর চুপ চাপ বসে থাকবে।
- আপনি যদি একটি পুরুষ কবুতর কিনতে চান তাহলে সেই কবুতর ভালোভাবে ডাকে কিনা সেটা দেখে নিবেন।
- একটি ভালো কবুতর তার চোখ দেখেই চিনতে পারবেন। তার চোখ অনেক পরিষ্কার থাকবে।
কবুতর কত বছর বাঁচে
কবুতর যদি জংলি হয়ে থাকে তাহলে এ কবুতর সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। আর আমরা যারা গৃহ পালিত কবুতর দেখে থাকি তারা সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
তবে বিশেষ যত্ন সহকারে এবং ভালোমতো কবুতরের স্বাস্থ্য বজায় রেখে আরো দীর্ঘ সময় কবুতরকে বেঁচে রাখানো যায়। যত্ন সহকারে কবুতর পালন করলে এটি ২০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। তাহলে বুঝতে পারছেন কবুতর কত বছর বাঁচতে পারে।
কিছু কবুতরের জাতের নাম
আমাদের দেশে এখন বাণিজ্যিক ভাবে অথবা শখের বসে অনেক দেশি বিদেশি জাতের কবুতর পালন করা হয়। এই সকল জাতের কবুতরের নাম একেক রকম। আপনি যদি এই সকল কবুতরের জাত সম্পর্কে না জেনে থাকেন তাহলে চলুন এখন জেনে নেওয়া যাক।
গোলা কবুতরঃ এটি একটি দেশি জাতের কবুতর। এই কবুতর সকলেই প্রায় বাড়িতে ছেরে দিয়ে পালন করে। হাস মুরগির কতো এই কবুরত ও পালন করা হয়।
ময়ূরপঙ্খী অথবা লাক্কাঃ এই কবুতর দেখতে অনেকটা ময়ুরের মতো। এর লেজের পাখনা ময়ুরের মতো ফুলানো এবং বিছানো থাকে। এই কবুতরকে অনেকে শকের বসেই পালন করে থাকেন।
এই সকল কবুতর বাদেও আরো অনেক কবুতরের জাত রয়েছে। যেগুলর নাম হয়তো আপনি ইতিপূর্বে কখনো শুনেন নাই। তাহলে চলুন এখন সেই কবুতরের জাতের নাম সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
দেশি কবুতরের জাতঃ
- গোলা
- দেশি গিরিবাজ
- জালালি কবুতর
গিরিবাজ জাতের কবুতরঃ গিরিবাজ জাতের কবুতরকে দুইভাবে ভাগ করা যায়। ১. সাধারণ গিরিবাজ এবং ২. হাইফ্লায়ার গিরিবাজ জাত। তাহলে চলুন এই সকল জাতের নাম আমরা ছকের মাধ্যমে জেনে নেই।
বেশি বাচ্চা পাওয়ার জন্য কী কী বিষয় গুরুত্বপূর্ণ?
শুধু ভালো জাত হলেই বেশি বাচ্চা পাওয়া যায় না। নিচের বিষয়গুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ:
- পুষ্টিকর খাবার (ভুট্টা, গম, ডাল, খনিজ লবণ)
- পরিষ্কার ও শুকনো খাঁচা
- এক জোড়া - এক বাসা ব্যবস্থা
- নিয়মিত পরিষ্কার পানি
- অতিরিক্ত গরম ও ঠান্ডা থেকে সুরক্ষা
কবুতর কত মাস বয়সে ডিম দেয়
একটি স্ত্রী কবুতর ৫-৬ মাস বয়সেই ডিম দেয়। আর যখন ডিম দিতে শুরু করে তখন প্রায় প্রতিমাসেই ডিম দেয়। তাই বলা যায়, কবুতর গড়ে প্রতিমাসে একবার করে ডিম দেয়। আর একটি কবুতর সাধারণত ২০ - ৩০ বছর বাঁচে। আর যদি জঙ্গলী কবুতরের দিকে দেখা হয় তাহলে একটি জঙ্গলী কবুতর ৫ বছর পর্যন্ত বেচেঁ থাকে।
আর একটি গৃহপালিত কবুতর ১০ - ১৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে। কবুতর ডিম দেওয়ার ১৭ - ১৮ দিন পরেই ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বের হয়। আর এই কবুতরের বাচ্চা যখন ফোটে তখন থেকে বাচ্চার বয়স ২৫,৩০ দিন হলেই খাওয়ার উপযোগি হয়।
কি খাওয়ালে কবুতর তাড়াতাড়ি ডিম দেয়
যেই সকল ব্যাক্তিগণ কবুতর ব্যাবসার উদ্দেশ্যে অথবা বাড়িতা লালন পালন করে থাকেন তারা কবুতরের ডিম এবং বাচ্চা নিয়ে অনেক সময় চিন্তার মধ্যে থাকেন। তারা তেমনভাবে জানেন নাহ যে কি খাওয়ালে কবুতর তাড়াতাড়ি ডিম দেয় বেশি বেশি। তাদের জন্য আজকের এই আর্টিকেলটি। চলুন তাহলে এখন সেই বিষয়ে জেন নেওয়া যাক।
আমরা সকলেই কবুতরকে গম অথবা বিভিন্ন দানা শস্য খাইয়ে থাকি। যেমন ভুট্টা, রাইন শরিসা, চাউল ইত্যাদি। তাই আপনি যদি জানতে নিচের দেখানো খাবার নিয়োমিত খাওয়ান তাহলে কবুতর খুব তারা ডিম দিবে বেশি পরিমাণে। সেই সকল খাবার সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হয়েছে।
মাটিঃ কবুতর নোনতা মাটি খেতে পছন্দ করে। আপনি কবুরতকে যদি খাঁচায় বন্দি অবস্থায় পালন করে থাকেন তাহলে অবশ্যই কবুতরকে মাটি খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। আর যদি কবুতর ছেরে অর্থাৎ মুক্ত অবস্থায় পালন করে থাকেন তাহলে কবুতর তার জন্য প্রয়োজনীয় মাটি নিজেই গ্রহণ করবে।
কচি গাছঃ আপনারে খেয়াল করে থাকবেন কবুতর বাহিরে থাকা গাছের কচি পাতা খেতে ভালোবাসে। তাই আপন কবুতরকে নিয়োমিত গাছের কচি পাতা অথবা কচি গাছ খাওয়ান। যেমনঃ মিষ্টি কুমড়া গাছের মাথা, পুইশাক গাছের কচি মাথা, পুইশাক গাছের ফল ইত্যাদি।
গ্রিডঃ আপনি কবুতকরকে গ্রিড খাওয়াতে পারেন।কবুতর গ্রিড খেতে খুবই পছন্দ করে থাকে। আর এটি কবুতরের জন্য অনেক উপকারি।
ডিমের খোসাঃ আপনি যদি কবুতরকে নিয়মিত প্রতিদিন ডিমের খোসা গুড়ো করে খেতে দিন এতে করে কবুতরের শরীরের ডিমের খোসা অনেক পুষ্ট হবে। আর কবুতরও নিয়োমিত ডীম দিবে। আপনি যদি নিয়োমিত ডিম পেতে চান তাহলে অবশ্যই আপনাকে কবুতরকে ডিমের খোসা খাওয়াতে হবে।
ই কাপ ক্যাপসুলঃ একটি কবুতরকে প্রতি সাপ্তাহে নিয়ম করে ৩ দিন সকালে খালি পেটে এই ক্যাপসুল খাওয়ান। আর অবশ্যই কবুতরকে এই ঔষধ প্রতিদিন খাওয়াবেন না। তাতে কবুতর ডিম দিবে ঠিকই কিন্তু সেই কবুতর বাচ্চা ফোটাবে না। শুধু ডিম দিতেই ব্যাস্ত থাকবে সেই কবুতর।
উপসংহার
কোন জাতের কবুতর বেশি বাচ্চা দেয় এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো কিং, সিরাজি ও হোমার কবুতর। তবে সঠিক যত্ন, খাবার ও পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে প্রায় সব ভালো জাতের কবুতর থেকেই নিয়মিত ও বেশি বাচ্চা পাওয়া সম্ভব। তাই জাত নির্বাচনের পাশাপাশি পরিচর্যার দিকেও সমান গুরুত্ব দিন।
